সর্বশেষ আপডেট : ১ ঘন্টা আগে
শনিবার, ১৫ অগাস্ট ২০২৬ খ্রীষ্টাব্দ | ৩১ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ |

DAILYSYLHET

তীব্র গ্যাস সংকটে সিলেট : প্রভাব পড়েছে সর্বত্র

মামুন পারভেজ, অতিথি লেখক ::

জাতীয় পর্যায়ে গ্যাস সরবরাহে তীব্র সংকটের প্রভাব এবার স্পষ্ট হয়ে উঠেছে সিলেটজুড়ে। গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় নগরের সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলোতে দীর্ঘ লাইন, গণপরিবহনে সংকট এবং বাড়তি ভাড়া আদায়ের অভিযোগ উঠেছে। একই সঙ্গে হবিগঞ্জের ১৭১টি শিল্পকারখানায় উৎপাদন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় কর্মহীন হয়ে পড়েছেন বিপুলসংখ্যক শ্রমিক। তৈরি হয়েছে রপ্তানি আদেশ ও শিল্পখাতে বড় ধরনের ক্ষতির আশঙ্কা।

শুক্রবার ভোর থেকেই সিলেট নগরের বিভিন্ন সিএনজি ফিলিং স্টেশনে শত শত অটোরিকশা, মাইক্রোবাস ও ব্যক্তিগত গাড়ির দীর্ঘ সারি দেখা যায়। কোথাও কোথাও দুই থেকে তিন কিলোমিটার পর্যন্ত যানবাহনের সারি তৈরি হয়। অনেক চালক ভোর চারটা থেকে লাইনে দাঁড়িয়েও ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষার পর প্রয়োজনীয় পরিমাণ গ্যাস পাননি।

শুক্রবার বেলা ১১টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত নগরের কয়েকটি ফিলিং স্টেশন ঘুরে দেখা যায়, গ্যাসের চাপ এতটাই কম যে কোথাও ৮ লিটারের সিলিন্ডারে মাত্র ৮০ থেকে ১০০ পয়েন্ট পর্যন্ত গ্যাস দেওয়া হচ্ছে। কোনো কোনো পাম্পে ৮০ বা ৯০ পয়েন্ট দেওয়ার পরই সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে।

এতে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন সিএনজিচালিত অটোরিকশার চালকরা। আম্বরখানা এলাকার কয়েকজন চালক জানান, তাঁরা ভোর চারটা থেকে লাইনে দাঁড়িয়ে সকাল ১০টার দিকে গ্যাস পেয়েছেন। কিন্তু গ্যাসের পরিমাণ এত কম ছিল যে তা দিয়ে সারাদিন গাড়ি চালানো সম্ভব নয়।

গ্যাস সংগ্রহ করতে নগরীর উপশহর থেকে সোবহানীঘাট পর্যন্ত পাম্পে দাড়িয়ে থাকা অটোরিক্সার দীর্ঘ লাইন। ছবি : জয়নাল আবেদীন আজাদ

এক চালক জানান, গাড়ির মালিককে জমা দিতে হয়, পাশাপাশি নিজের সংসারও চালাতে হয়। তাই বাধ্য হয়ে যাত্রীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত ভাড়া নিতে হচ্ছে।

অন্যদিকে, সিএনজি না পেয়ে কেউ কেউ বিকল্প হিসেবে এলপি অটোগ্যাস নিচ্ছেন। ছালিয়া-রঙ্গিটিলা এলাকার একটি পাম্পে প্রতি লিটার এলপি গ্যাসের দাম ৮৪ টাকা। সেখানে সিএনজি গ্যাসের দাম প্রায় ৪৩ টাকা। ফলে দ্বিগুণ ব্যয়ে জ্বালানি কিনতে হওয়ায় চালকদের খরচও বেড়ে গেছে।

গ্যাস সংকটের সরাসরি প্রভাব পড়েছে গণপরিবহনে। গাড়ির সংখ্যা কমে যাওয়ায় বিভিন্ন রুটে যাত্রীদের দুর্ভোগ বেড়েছে। একই সঙ্গে ৫ থেকে ১০ টাকা পর্যন্ত বাড়তি ভাড়া নেওয়ার অভিযোগ করেছেন যাত্রীরা।

আম্বরখানা থেকে বিমানবন্দর রুটে নিয়মিত ২০ টাকার ভাড়া শুক্রবার নেওয়া হয়েছে ৩০ টাকা। আম্বরখানা থেকে টিলাগড় এবং মদিনা মার্কেট রুটে ১৫ টাকার ভাড়া বেড়ে হয়েছে ২০ টাকা। বন্দর থেকে মেন্দিবাগ, অর্থাৎ রোজভিউ হোটেলের সামনে পর্যন্ত নিয়মিত ১৫ টাকার পরিবর্তে ২০ টাকা নেওয়ার অভিযোগও করেছেন যাত্রীরা।

যাত্রীদের অভিযোগ, কোনো ঘোষণা বা সরকারি অনুমোদন ছাড়া এভাবে ভাড়া বাড়ানো অযৌক্তিক। তবে চালকদের দাবি, তাঁরা ইচ্ছা করে ভাড়া বাড়াচ্ছেন না। প্রয়োজনীয় গ্যাস না পাওয়ায় গাড়ি কম চালাতে হচ্ছে, আয় কমে গেছে এবং বাড়তি দামে বিকল্প জ্বালানি কিনতে হচ্ছে। এসব কারণে অতিরিক্ত ভাড়া নিতে তাঁরা বাধ্য হচ্ছেন।

গ্যাস সংকটের কারণে আগামী পাঁচ দিন সিলেট বিভাগের ৫৬টি সিএনজি ফিলিং স্টেশন প্রতিদিন সন্ধ্যা ৬টা থেকে সকাল ৮টা পর্যন্ত বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে সিলেট জেলায় রয়েছে ৩৮টি ফিলিং স্টেশন।

বৃহস্পতিবার এ সিদ্ধান্তের ঘোষণা আসার পর শুক্রবার ভোর থেকেই বিভিন্ন পাম্পে ব্যাপক ভিড় তৈরি হয়। চালকদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দেয় এবং কয়েকটি পাম্পে বিক্ষোভও হয়।

ফিলিং স্টেশন মালিকদের অভিযোগ, পর্যাপ্ত আগাম নোটিশ ছাড়াই এমন সিদ্ধান্ত নেওয়ায় সাধারণ মানুষ, চালক ও যাত্রীরা চরম দুর্ভোগে পড়েছেন। তবে জনদুর্ভোগ বিবেচনায় নগরীর কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ফিলিং স্টেশন সীমিত পরিসরে চালু রাখা হয়েছে।

জালালাবাদ গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন সিস্টেম লিমিটেড জানিয়েছে, এলএনজি টার্মিনালের কারিগরি ত্রুটির কারণে জাতীয় পর্যায়ে প্রাকৃতিক গ্যাসের সরবরাহ অনাকাঙ্ক্ষিত মাত্রায় কমে গেছে। এর ফলে জালালাবাদ গ্যাসের বিতরণ এলাকায় চাপ কমে যায় এবং গ্রাহকদের গ্যাস ব্যবহার ৫০ শতাংশের মধ্যে সীমিত রাখার অনুরোধ জানানো হয়।

তবে এই সংকট শুধু পরিবহন খাতেই সীমাবদ্ধ নেই। এর বড় ধরনের প্রভাব পড়েছে হবিগঞ্জের শিল্পখাতে।

সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, হবিগঞ্জের ১৭১টি শিল্পকারখানায় উৎপাদন কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে। প্রায় ২০ দিন ধরে গ্যাস সরবরাহ কম থাকলেও বুধবার থেকে অনেক কারখানায় সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়।

এর ফলে প্রায় দেড় লাখ শ্রমিক প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে কর্মহীন হয়ে পড়েছেন বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের।

শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর দাবি, গ্যাস না থাকায় প্রতিদিন কোটি কোটি টাকার উৎপাদন ক্ষতি হচ্ছে। সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে শতভাগ রপ্তানিমুখী কারখানাগুলো। সময়মতো বিদেশি ক্রেতাদের কাছে পণ্য পাঠাতে না পারলে রপ্তানি আদেশ বাতিল হওয়ার আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে।

যমুনা ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কে প্রায় ১২ হাজার শ্রমিক কাজ করেন। প্রতিষ্ঠানটির মহাব্যবস্থাপক আবুল হোসেন জানান, তাঁদের দৈনিক প্রায় ১৩ দশমিক ৬ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস প্রয়োজন। কয়েক দিন ধরে তাঁরা মাত্র ৩ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস পাচ্ছিলেন। বুধবার রাতের পর সেটিও পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়।

বাদশা পাইওনিয়র প্রতিষ্ঠানে প্রায় ১৬ হাজার শ্রমিক কাজ করেন। প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তা খায়রুল আলম জানান, কয়েক দিন ধরে চাহিদার এক-তৃতীয়াংশ গ্যাস পাওয়া গেলেও বর্তমানে সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ। এতে উৎপাদন ও শিপমেন্ট মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।

সায়হাম গ্রুপে প্রায় ২৭ হাজার শ্রমিক ও কর্মকর্তা রয়েছেন। প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তা প্রকৌশলী মো. রেজাউল হক জানান, গ্যাসনির্ভর বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় কারখানার উৎপাদনও পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে।

প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের হবিগঞ্জ ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কেও বুধবার সন্ধ্যা থেকে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। সেখানে প্রায় ৩৫ হাজার শ্রমিক কাজ করেন।

অন্যদিকে স্কয়ার ডেনিমের কর্মকর্তা আব্দুল মাজেদ আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, সময়মতো রপ্তানি পণ্য পাঠানো সম্ভব না হলে দেশের তৈরি পোশাকশিল্পের আন্তর্জাতিক সুনাম ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

জালালাবাদ গ্যাসের শাহজীবাজার আঞ্চলিক কার্যালয়ের প্রধান মো. খালেদ গনি জানান, হবিগঞ্জে প্রতিদিন প্রায় ৬০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের প্রয়োজন হলেও বর্তমানে পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ২০ মিলিয়ন ঘনফুট। বিদ্যুৎ উৎপাদনকেন্দ্রে সরবরাহ বাড়ানোর কারণে শিল্পখাতে গ্যাস কম দিতে হচ্ছে। তাঁর আশা, আগামী দুই থেকে তিন দিনের মধ্যে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হতে পারে।

প্রতিষ্ঠানটির উপ-মহাব্যবস্থাপক মো. রুহুল করিম চৌধুরী জানান, জাতীয় পর্যায়ের গ্যাস সংকট জুলাইয়ের শেষ সপ্তাহ থেকেই শুরু হয়েছে। স্থানীয় গ্যাস উৎপাদন কমে যাওয়া এবং বিদ্যুৎকেন্দ্রে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে গ্যাস সরবরাহের কারণে শিল্প ও সিএনজি খাতে সংকট আরও তীব্র হয়েছে।

এদিকে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে প্রশাসনও বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করছে।

সিলেটের জেলা প্রশাসক আব্দুল্লাহ আল মামুন জানিয়েছেন, সিএনজি ফিলিং স্টেশন ও কনভারশন ওয়ার্কশপের নেতৃবৃন্দের সঙ্গে বৈঠক হয়েছে। গ্যাস সরবরাহ ৫০ শতাংশে নেমে যাওয়ার কারণে পাঁচ দিনের জন্য নির্দিষ্ট সময় ফিলিং স্টেশন বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত হয়েছে।

তিনি জানান, সিলেট বিভাগে মোট ৫৬টি ফিলিং স্টেশন রয়েছে। এর মধ্যে সিলেট জেলায় ৩৮টি। পরিস্থিতি রেশনিংয়ের মাধ্যমে সামাল দেওয়া যায় কি না, সে বিষয়েও আলোচনা হয়েছে। তবে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, রেশনিং করে গ্যাস দিলে পাম্পগুলোতে আরও বেশি যানজট তৈরি হতে পারে।

জেলা প্রশাসক আরও জানান, পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে পুলিশ সুপারসহ সংশ্লিষ্ট অন্যান্য অংশীজনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হচ্ছে। বাড়তি ভাড়া আদায়ের অভিযোগের বিষয়েও ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

সব মিলিয়ে সিলেটে গ্যাস সংকট এখন শুধু জ্বালানি সংকট নয়; এর প্রভাব পড়েছে পরিবহন, যাত্রীসেবা, শিল্প উৎপাদন, শ্রমবাজার ও রপ্তানি খাতে।

সাম্প্রতিক পরিসংখ্যানও পরিস্থিতির গভীরতা তুলে ধরছে। ২০১৮ সালে দেশে দৈনিক প্রায় ২৭০ কোটি ঘনফুট গ্যাস উৎপাদিত হলেও ২০২৬ সালের মার্চে স্থানীয় উৎপাদন কমে প্রায় ১৭০ কোটি ঘনফুটে নেমে এসেছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, স্থানীয় গ্যাস উৎপাদন হ্রাস, এলএনজি আমদানির সীমাবদ্ধতা এবং বিদ্যুৎকেন্দ্রে বাড়তি গ্যাসের চাহিদা—এই তিনটি কারণ একসঙ্গে সংকটকে আরও তীব্র করেছে।

দ্রুত সংকটের সমাধান করা না গেলে এর নেতিবাচক প্রভাব শুধু সিলেটের পরিবহন বা হবিগঞ্জের শিল্পকারখানায় সীমাবদ্ধ থাকবে না; দেশের রপ্তানি, কর্মসংস্থান এবং সামগ্রিক অর্থনীতিতেও এর বড় প্রভাব পড়তে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

Comments are closed.

এ বিভাগের অন্যান্য খবর

নোটিশ : ডেইলি সিলেটে প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, আলোকচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করা বেআইনি -সম্পাদক

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত

২০১১-২০১৭

সম্পাদক ও প্রকাশক: খন্দকার আব্দুর রহিম
নির্বাহী সম্পাদক: মারুফ হাসান
অফিস: ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি, ৯ম তলা, জিন্দাবাজার, সিলেট।
মোবাইল: ০১৭১২ ৮৮৬ ৫০৩
ই-মেইল: dailysylhet@gmail.com

Developed by: